হরবোলা — দিবাকর দাস

দিবাকর দাসের ক্রাইম থ্রিলার হরবোলা ক্ষণে ক্ষণে ভোল পাল্টিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করে, গল্পের গতিপথ বা চরিত্রগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিধা তৈরি করে। বাস্তবতার নিরিখে পাঠককে নতুন অভিজ্ঞতা উপহার দেবার প্রতিজ্ঞা করেছেন লেখক। বইটা নিয়ে অনেকের উচ্ছ্বাস দেখে অনুমান করছি সফলও হয়েছেন অনেকাংশেই।

দুই পক্ষের ইঁদুর-বিড়াল খেলা নিয়ে কাহিনী অগ্রসর হয়েছে। এক পক্ষে আছে আর্মির গোয়েন্দা সংস্থার এক বিশেষ শাখার সদস্যবৃন্দ। আরেকপক্ষে পাহাড়ের ভয়ংকর আতঙ্কবাদী বিজন সাহু ও তার দলবল। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধর ও কৌশলী বিজন সাহুর পরবর্তী লক্ষ্য সমতল জয়। দেখবার বিষয় গোয়েন্দা সংস্থা কীভাবে তাকে থামায় বা আদপেও সক্ষম হয় কিনা!

হরবোলার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এর মেদহীন কাহিনী বিন্যাস। এবং আমার মনে হয় দুর্বল দিকও এটি! খুবই অল্প শাখা প্রশাখা বিস্তার করে কাহিনী আগানোয় তা গল্পকে গতি দিয়েছে। সহজেই পাঠককে গল্পের গভীরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। তেমন বিশেষ কোন ন্যারেটিভ মাথায় রাখার দরকারও পড়েনা। এর ফলে পাঠকের মনোযোগ দ্রুত ধরা গেছে। কিন্তু একই সাথে পার্শ্ব-চরিত্রগুলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে, যেহেতু মোটা দাগে তাদের তেমন কোন ভূমিকা নেই মূল কাহিনীতে। পাঠককে বিভ্রান্ত করার প্রাণহীন ঘুঁটি হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে তারা দিনশেষে। মেদহীন ন্যারেটিভে তাদের উপস্থিতি সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে এজন্য। এমনকি একই কারণে, এই চরিত্রগুলো কখন কীভাবে ব্যবহার করা হবে গল্পে সেটাও যেন লেখক খেই হারিয়ে ফেলেছেন! আমার মনে হয়, এদেরকে ব্যবহার করে আরেকটু সুতো ছাড়ালে পরে গোছাতে সুবিধা বেশী হতো।

বইয়ের মাঝপথে থাকাকালীন একসময় বউকে বলেছিলাম, বইটা তো মজার, মনে হচ্ছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “ইনফারনাল অ্যাফেয়ার্স / দ্য ডিপার্টেড” পড়ছি! যদিও মূল চমক দুই জায়গায় দুইভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। তবুও সাদৃশ্য উপেক্ষা করার মতো না। অন্ততঃ আমার জন্য এটা বিশাল চমক আকারে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বই শেষে “বিগ রিভিল” অ্যাপ্রোচে না গিয়ে যদি আরও বেটার সেটআপ অ্যান্ড পেঅফস্‌ দেওয়া হতো তাহলে মনে হয় জিনিসটা বেশী সুখাদ্য হতো।

ঘটনা প্রবাহে সময়কাল অনুল্লেখ রেখে পাঠককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাটাও ভালো লাগেনি। এর জন্য বরং কাহিনীর দারুণ ফ্লো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হোঁচট খেতে হয়েছে। এটার কোন প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারিনি।

দিবাকর দাসের এটাই আমার প্রথম পড়া বই। আমি উনার ঝরঝরে লেখার ভক্ত হয়ে গেছি অস্বীকার করার জো নেই। অন্যান্য সব বই পড়ে ফেলার ইচ্ছে রাখি।

বইয়ের প্রচ্ছদ দারুণ লেগেছে। রাইফেল, নামলিপি, যে গুলি করছে সেই আবার টার্গেট অবয়ব—সবকিছু দুর্দান্ত লেগেছে। বইয়ের প্রোডাকশন ভ্যাল্যুতে সন্তুষ্ট—বাঁধাই, পৃষ্ঠা সবকিছুই ভালো লেগেছে।

বই : হরবোলা
লেখক : দিবাকর দাস
প্রকাশনা : ভূমিপ্রকাশ
প্রকাশকাল : ২০২০
প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১৬০
মলাট মূল্য : ২৪০